বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৪ পূর্বাহ্ন
কমলগঞ্জ প্রতিনিধি : মৌলভীবাজার জেলায় কমলগঞ্জে মণিপুরী অধ্যুষিত মাধবপুর গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় এখন রাস উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে পরিস্কার, পরিচ্ছন্নতা রং এর কারুকাজ। ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অন্যতম মণিপুরী সম্প্রদায়ের সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব মহারাসলীলা আগামী ২৭ নভেম্বর সোমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আনন্দ-উৎসাহে ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল মন্দিরা আর শঙ্খ ধ্বনির মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও তার সখি রাধারলীলাকে ঘিরে এ দিন পালিত হবে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। মাধবপুরে একি সাথে, একি সময় তিনটি মণ্ডপে শুরু ও শেষ হয়ে থাকে। এমন বর্ণিল উৎসব উপমহাদেশের একটিই বলা চলে তাই এখানেই মানুষের জনস্রোতের ধারা বহে থাকে। বালক ও তরুণী প্রায় শতাধিক শিল্পী রাস লীলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। মনিপুরীদের এই রাস উৎসবে দেশি বিদেশী পর্যটকসহ কয়েক লক্ষ ভক্ত ও দর্শকরা আসেন।
এই দিন দুপুরে উৎসস্থল মাধবপুরের শিববাজার মাঠ প্রাঙ্গণে হবে গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য। রাতে জোড়া মণ্ডপে রাসের মূল প্রাণ মহারাসলীলা। প্রায় ০১ মাস ধরে মণিপুরী পল্লীর তিনটি বাড়ির উঠোনে ছেলেরা ও তিনটি বাড়ির উঠোনে মেয়েরা নাচছে। নাচের প্রশিক্ষণ ও রাসনৃত্যের মহড়া চলছে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে। এগুলো এখন শেষ সময়ের প্রস্তুতি।
আরও পড়ুন: শীত মোকাবেলায় লেপ তোষক তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে উঠছেন কারিগররা
রাসনৃত্যকে নিখুঁত ও নিপুনভাবে তুলে ধরতে প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গিয়েছে । মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় মহোৎসব“মহারাসলীলা”। রাসোৎসবে মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজনের পাশাপাশি অন্যান্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার লোকজন মেতে উঠবে একদিনের মহা উৎসবে। মহারাত্রির আনন্দের পরশ পেতে আসা হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, কবি-সাহিত্যিক, লেখক,গবেষক, সাংবাদিক,সাংস্কৃতি প্রেম, দেশি-বিদেশি পর্যটক, বরেণ্য জ্ঞানী-গুণী লোকজনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে মাধবপুর উৎসব প্রাঙ্গণ।
রাসোৎসবকে ঘিরে মাধবপুর মণ্ডপগুলো সাজানো হয়েছে কলাগাছ, বাঁশ,বেত, সাদা কাগজের নকশার নিপুণ কারুকাজে। করা হয়েছে আলোকসজ্জাও। সেখানে মণিপুরী শিশু নৃত্যশিল্পীদের সুনিপুণ নৃত্যাভিনয় রাতভর মনমুগ্ধ করে রাখবে লাখো ভক্ত ও দর্শনার্থীদের।মণিপুরী পল্লীর এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ ভারত থেকেও মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজনসহ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে অনেকেই ছুটে আসেন মহারাসলীলা অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য। এবার মাধবপুর জোড় মণ্ডপে ১৮১ তম রাস উৎসব। মাধবপুরের রাসমেলার আয়োজক হচ্ছে মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘ।
উৎসবের অন্তঃস্রোত, রসের কথা, আনন্দ-প্রার্থনা, উৎসবের ভেতরের কথা হচ্ছে বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও সত্যসুন্দর মানবপ্রেম।আয়োজক মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘ জানিয়েছেন, রাস উৎসবকে সফল করতে প্রায় মাস খানেক ধরে ছয়টি বাড়িতে রাসনৃত্য এবং রাখালনৃত্যের প্রশিক্ষণ ও মহড়া চলছে। ৩ টিতে রাসনৃত্য ও ৩ টিতে রাখাল নৃত্য। মাধবপুরে ৩ টি জোড়া মণ্ডপের আওতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরোহিতের পরামর্শে একজন সুদক্ষ প্রশিক্ষক ধর্মীয় বিধিবিধান মতো গোপী বা শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেন। গোপীবেশী শিল্পীদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছর। শুধুমাত্র রাধার বয়স ৫ থেকে ৬ বছর। নৃত্যের প্রতিটি দলে নূন্যতম ১০০ শত জন অংশ নিয়ে থাকে। একইভাবে রাখাল নৃত্যেরও প্রতিটি দলে ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী বালক অংশ নিয়ে থাকে।
একটানা বিরতিহীন নাচ করেন শিল্পীরা। ১১টা থেকে ‘গোষ্ঠলীলা বা রাখালনৃত্য’ দিয়ে। গোষ্ঠলীলায় রাখাল সাজে কৃষ্ণের বালকবেলাকে উপস্থাপন করা হবে। এতে থাকবে কৃষ্ণের সখ্য ও বাৎসল্য রসের বিবরণ। গোধূলি পর্যন্ত চলবে রাখালনৃত্য। সন্ধ্যা ৭ টায় উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাত ১১টা থেকে পরিবেশিত হবে মধুর রসের নৃত্য বা শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ। রাসনৃত্য ভোর (ব্রাহ্ম মুহূর্ত) পর্যন্ত চলবে। রাসনৃত্যে গোপিনীদের সাথে কৃষ্ণের মধুরলীলার কথা, গানে ও সুরে ফুটিয়ে তুলবেন শিল্পীরা। মাধবপুর মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ জানান, ইতিমধ্যে রাসোৎসবের সুন্দর ভাবে আয়োজনের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।